প্রিন্ট ভিউ
এস এম রবিউল : জন্মের কিছু দিন পর মা ছেড়ে চলে যান। আর দুই বছর না পেরতেই জনতার পিটুনিতে প্রাণ হারালেন বাবা। ফলে পুরোপুরি এতিম হয়ে গেল ফরিদপুরের ছোট্ট শিশু মুসলিমা ইসলাম (২৫ মাস)। এখন তার ভরসা শুধু দাদা-দাদী- যাদের চোখে এখন শোকের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ।
শনিবার ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর ইউনিয়নের সাতৈর গ্রামে নিহত ট্রাকচালক হান্নান শেখের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। বাড়িতে শোকের মাতম, স্বজনদের কান্না আর মানুষের ভিড়ের মাঝেই কিছু না বুঝে কখনো নানার কোলে, কখনো অন্যের কোলে ঘুরছে মুসলিমা। ফিডারে দুধ খাচ্ছে, আবার হঠাৎ হাউমাউ করে কেঁদে উঠছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, মুসলিমার মা আরিফা বেগম তার জন্মের ২১ দিন পর স্বামীকে ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। এরপর থেকে দাদা শাহিদ শেখ ও দাদী নার্গিস বেগমই তাকে লালন-পালন করে আসছেন। তবে হান্নানের মৃত্যুর খবর পেয়ে তার স্ত্রী আরিফা বেগম তাদের বাড়িতে আসেন।
দাদী নার্গিস বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলেকে ওরা গুজব ছড়িয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এখন আমার নাতীর বাবা নাই, মা থাকতেও এখন নাই। এখন মুসলিমার কি হবে।
নিহতের বাবা শাহিদ শেখ বলেন, আমার ছেলে সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিল। সে অপরাধ করে থাকলে আইনের হাতে তুলে দেওয়া যেত। কিন্তু গুজব ছড়িয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো। এখন এই বাচ্চার ভবিষ্যৎ কী?
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের বিলনালিয়া এলাকায় দ্রুতগতির একটি ট্রাক কয়েকজন পথচারীকে ধাক্কা দেয়—এমন অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। এরই মধ্যে “ট্রাকটি ২০ জনকে চাপা দিয়েছে” এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
একপর্যায়ে স্থানীয়রা ইট-ব্লক ফেলে রাস্তা অবরোধ করে ট্রাকটি থামায়। পরে চালক হান্নান শেখকে ট্রাক থেকে টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে বেধড়ক মারধর করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ফরিদপুর হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় ট্রাকের দুই হেলপার নাঈম (২২) ও আল-আমিন (২৫) আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের দু'জনের বাড়ি সালথা থানায়। এছাড়া স্থানীয় অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
নগরকান্দা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মাহমুদুল হাসান জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আহতদের হাসপাতালে পাঠায়। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, গুজব ছড়িয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে হান্নানকে।
এদিকে স্থানীয়দের একাংশ বলছেন, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে জনতা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল।
এ ঘটনায় সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে ছোট্ট মুসলিমা। মা-বাবাহীন এই শিশুটির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তায় ঘেরা।